সান্তাহারের ইতিহাস ঐতিহ্য

আমি আমার প্রাণের শহর সান্তাহারের ইতিহাস লিখছি

santahar-2

আমরা যারা এ শহরে অবস্থান করছি তাদের কথা বাদ দিন। আপনারা যারা এ শহরকে ছেড়ে গেছেন জীবিকার জন্য বা অন্য কোনো কারনে। কেমন লাগে আপনাদের? বুকের মধ্যে বেহালার করুন সুর বেজে ওঠে কি? মোচর দিয়ে ওঠে,স্টেশান, রেলগেট, ঠক্কর, কলেজ চত্তর, সাইলো রোড হোটেল স্টারের সেই আড্ডাগুলোর কথা মনে হলে? যে মেয়েগুলো বিয়ের কারণে চলে গেছেন সান্তাহার কে ছেড়ে, সান্তাহারের কথা মনে হলে পাশে থাকা আপন মানুষটিকে অচেনা মনে হয়?
জি, পাঠক। আজ আমি সেই সান্তাহারের কথা বলছি। একটু বড় লেখা হবে। ধৈর্য্য ধরে পরবেন।
অবস্থান: -২৪°৪৮′২৬″উত্তর
৮৮°৫৯′১০″পূর্ব /
২৪.৮০৭১° উত্তর
৮৮.৯৮৬১° পূর্ব।
পৌর ও জংশন শহর হিসাবে সান্তাহারের ঐতিহ্য ও গুরুত্ব প্রায় ১৩০ বছরের অধিক সময় ধরে বাংলাদেশব্যাপি বিস্তৃত। বৃটিশ সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে ১৮২১ খৃষ্টাব্দে আদমদীঘি থানা রাজশাহী জেলা হতে পৃথক হয়ে নবগঠিত বগুড়া জেলার সাথে একীভূত করা হয়। উল্লেখ্য, তৎকালীন সময়ে পার্শ্ববর্তী নওগাঁ সদর থানা তথা নওগাঁ জেলার কোন অস্তিত্ব ছিলনা। বর্তমানে নওগাঁ সদর থানার সুলতানপুর, পার-নওগাঁ, তিলকপুর ইউনিয়ন এবং জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়ন আদমদীঘি থানার অর্ন্তগত ছিল বলে বিভিন্ন সরকারী দলিলপত্র হতে জানা
যায়।
১৮০০ খৃঃ শেষ ভাগে ভারত উপমহাদেশে যে সামাণ্য কয়েকটি শহর দ্রুত আধুনিক হয়ে ওঠে সান্তাহার তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে এটা সান্তাহার নামে পরিচিত হলেও এর পূর্ব নাম সুলতানপুর। মূলত তখন এটি রাজশাহী জেলার অন্তর্গত ছিলো।
ইষ্ট ইন্ডিয়া কোস্পানির ভাইসরয় লর্ড ডালহৌসি আসার পরথেকে এ অঞ্চলে রেল সম্প্রসারনের কাজ শুরু হয়।
ভারত উপমহাদেশে রেল সম্প্রসারনের জন্য বৃটিশ সরকারের পদক্ষেপে ১৮৫০ এর দিকে প্রথম খুলনা এলাকায় প্রথ কাজ শুরু করলেও মাটির কারণে তা ব্যার্থ হয়। পরবর্তিতে রাণী ভবানির প্রচেষ্টায় ১৮৭৮ সালে ইস্টার্ন স্টেট কোম্পানি নাটোর – পার্বতীপুর রেললাইন বসানোর কাজ শুরু কর। অভিজ্ঞ বৃটিশরা তখন যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নদীপথের সংযোগ শহর সুলতানপুর কে বেছে নেয়। যমুনা ও রক্তদহের তীরে এই শহরটিকে তারা স্টেশান স্থাপনের সিদ্ধানাত গ্রহন করে। যে মৌজাটির উপর স্টেশনটি অবস্থান করে আছে তা ছিল সাঁতাহার মৌজা। জমি অধিগ্রহণ করার পর তৎকালীন অধিকাংশ অফিসার ইংরেজী বা অন্য ভাষাভাষী হবার কারনে, তারা ইংরেজী তে সাঁতাহার লিখতে গিয়ে চন্দ্রবিন্দু থাকার কারণে সান্তাহার বানিয়ে ফেললেন। যেমন সাঁতাহারের বানানটি দেখুন সাঁ – San তা- Ta হার -Har.
সাঁতাহার কালক্রমে সান্তাহার হয়ে ওঠে।
পরে ইণ্টার্ন বেঙ্গল স্টেট কোস্পানী একত্রীকরন হলে ১৯০০ খৃঃ বগুড়ার নবাব আলতাফ আলীর একক প্রচেষ্টায় সান্তাহার – বোনারপাড়া রেললাইন চালু হলে এশহরের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়।যা ক্রমে জংশন স্টেশানে পরিনিত হয়। অবিভক্ত ভারতের উত্তরবঙ্গ ও
আসাম , ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ডের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে সান্তাহারকে সংযুক্ত করে পূর্বদিকে বগুড়া হয়ে
দিনাজপুর , রংপুর ও
লালমনিরহাটে যাওয়ার জন্য আগের রেললাইনের (ব্রডগেজ) সাথে আরও একটি রেললাইন (মিটারগেজ) নির্মিত হলে ‘সান্তাহার স্টেশন’ সান্তাহার জংশন স্টেশনে পরিণত হয়।
বৃটিষ নির্মাণশৈলীতে নির্মিত এ স্টেশান টিতে ১৯২৩ সাল থেকে বিদ্যুৎ, গরম ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেনীর যাত্রীদের বিশ্রামাগার ১৯১০ সাল থেকে টেলিগ্রাফ সুবিধা। যাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষনের জন্য ১৯০০ সাল থেকেই আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। নামাযের আযান সহ যাবতিয় ঘোসনার ব্যবস্থা যা এখনো অক্ষত অবস্থায় চালু। একটি উচ্চশ্রেনীর ভোজনালয় সহ প্লাটফ্রমে হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য আলাদা হোটেল। যাত্রিদের পারাপারের সুবিধায় দুইটি ওভারব্রীজ। ব্রডগেজ ও মিটারগেজ শংমিশ্রনে দুই ধরনের রেললাইন। জি আর পি থানা। রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনী র অফিস। অবিভক্ত ভারত উপমাহাদেশীয় রেল ব্যবস্থায় তখন সান্তাহারের উপর দিয়ে প্রতিদিন ভারতের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, শিলাইদাহ বা কলকাতার ট্রেন গুলো যাতায়াত করতো। দেশের দ্বীতিয় বৃহত্তম ট্রানশিপমেন্ট ইয়ার্ড,বৃহৎ ট্রানশিপমেন্ট ক্রেন, রেলওয়ে নিজস্ব ফায়ার ব্রিগেড, ১৯৪৫/৫০ সাল থেকে ৫ টি বিশালাকার ওভারহেড ট্যাংক থেকে পাইপ লাইনে কলোনিগুলোতে পানি সাপ্লাই হতো যা অনেক বড় শহরেও চিন্তার অতিত ছিলো। লোকোশেড ছিল এই সান্তাহারে। রেলওয়ে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ছিলো, তৎকালিন উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫ মেগাওয়াট। সাবেক প্রিঙ্গল ইনসটিটিউট যা বর্তমানে ওহাহেদ বক্স মিলনায়তন ছিল আমাদের প্রাণের শহর সান্তাহারের মানুষদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। প্রখ্যাত অভিনেতা জহুর গাঙ্গুলি ছবি বিশ্বাস সহ অনেক অভিনেতার অভিনয় ও পি সি সরকারের যাদু প্রদর্শন প্রত্যক্ষ করেছেন এলাকাবাসী। সোহরাওয়ার্দী, শের ই বাংলা ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাষানী, ফাতেমা জিন্না সহ অনেক প্রখ্যাত মানুষের পদচারনায় মুখরিত হয়েছে সান্তাহার। রেলওয়ে ইনসটিটিউটের ঐতিহ্যবাহী মাঠ সহ ৫ টি বড় বড় খেলার মাঠ যা এখনো বিদ্যমান। যে মাঠে এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত খেলোয়ার ফুটবল যাদুকর সামাদ সহ অসংখ্য দেশী বিদেশী খেলোয়ার এ মাঠে ক্রীয়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করে গেছেন। দেশের চারটি সাইলোর মধ্যে একটি সান্তাহারে। উত্তরবঙ্গের একমাত্র হাইওয়ে ওয়ার্কশপ, দেশের বৃহত্তম সি এস ডি, বি এ ডি সি গুদাম, বি সি আই সি বাফা গুদাম, মাৎস গবেষনা ইইনসটিটিউট, নিজস্ব টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, কেরু এন্ড কোং এর মাদকদ্রব্য পণ্যাগার, ল্যান্ড কাস্টমস অফিস, জুট মিল, উপমহাদেশের প্রাচীন হাসপাতাল যা দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধের সৈন্যদের জন্য নির্মিত, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা দুর্নীতি দমন অফিস,ডাক বাংলো সহ যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বললাম তার বয়স কোনটার ১০০ বছর আবার কোনোটার তার চেয়েও বেশি।
প্রথমে সোহরাওয়ার্দী স্কুল তার পরে মুসলিম হাই স্কুল সবশেষে সান্তাহার কলেজ। এর পূর্বে এটি ইউরোপিয় অফিসারদের উপাসনালয় ছিল। যা এখন মেয়েদের কমমনরুম।
রেলওয়ে শহর বিধায় এ শহরের অধিকাংশ কলোনীগুলো র নাম এখনো ড্রাইভার কলোনি, লোকো কলোনি, সাহেবপাড়া, হার্ড রানিং রুম,ইয়ার্ড কলোনি, কুলি পাড়া, কোচোয়ান পট্টি,সুইপার কলোনি। এ শহরের একটি কলোনির না চা বাগান হলেও এখানে কোনো চা বাগান ছিলোনা। এখানে আসামের চায়ের বাগানের শ্রমিক রা কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করতো। মূলত তারা পশ্চিমবঙ্গ বিহার বা উরিষ্যা অঞ্চলের চা বাগানের শ্রমিক। বছরের কিছু সময় চা বাগানে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব হলে বাগানের ঠিকাদার রা তাদের চিকিৎসার জন্য রেলওয়ে হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানে অবস্থান করতো যা এখনো চা বাগান নামএ পরিচিত।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বিহার বা দ্বারভাঙা সম্প্রদায়ের মানুষেরা বণ্যার পানির মতো এ শহরে প্রবেশ করে। রাজনৈতিক কারনে তারা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি শাষকদের মদদে তারা এ শহরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েক করে কয়েক বছর। তারা সান্তাহার কে দুটি ইউনিয়নে বিভক্ত করে। ১৯৬২ সালেবিহারী অধ্যুষিত শহর সান্তাহারকে আরবান এ্যারিয়া ঘোষনা করে। তার নাম দেয় খ ইউনিয়ন। এ পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলো আব্দুল করিম বিহারি। পিতা মকিম বিহারি সান্তাহারের স্টেশান মাস্টার ছিলেন। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী কালে ১৭ বছর এই বিহারিরা শাষনের নামে এ এলাকার বাঙালীর উপর নির্যাতন চালায়। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে ৩০০০০ বিহারী নিধন হয় এ শহরে।
২২ শে এপ্রিল এশহরে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী প্রবেশ করে নির্বিচারে সাধারন মানুষদের হত্যা করে। তারা হত্যা করে আধুনিক সান্তাহারের জনক জমিদার সুরেনন্দ্রনাথ তার স্ত্রী হরিভাবানী সহ সান্তাহারের বিষিষ্ট ব্যবসায়ী নূর চৌধুরি সহ তার পরিবার,এবং অসংখ্য পরিবারের মানুষ।
১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের সময় এটি পৌরসভায় উন্নিত হয়। এর প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন আমিরুল ইসলাম মঞ্জু, এরপর গোলাম মোরশেদ, ফিরোজ মোঃ কামরুল। বর্তমান চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন ভুট্ট। ১০.৫৪বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভার লোক সংখ্যা একলক্ষের উপরে। ভোটার ২৫০০০। ৩০ টি মসজিদ ৬ টি মন্দির ১০ টি সরকারি পপ্রথমিক বিদ্যালয়, ২ টি বে সরকারি কলেজ, তারমধ্যে একটি মহিলা, বালক উচ্চ ববিদ্যালয় ৩ টি বালিকা ১ টি সরকারি কলেজ ১ টি, সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ১ টি, ১ টি টেকনিকাল কলেজ দাদাখিল মাদ্রাসা সহ মাদ্রাসার সংখ্যা ৪ টি।বর্তমানে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দেশের প্রখম চাউলের সাইলো নির্মিত হয়েছে।
ধান চালে উদ্বৃত্ত এ শহর নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে অন্য শহরের চাহিদা পুরনে সমর্থ।
মাছ চাষে ব্যাপক সফলতার কথা সারা দেশ ব্যাপি সমাদৃত। ব্যবসা বাণিজ্যে এগিয়ে এ
শহরের রাস্তাঘাট অত্যন্ত আকর্ষনীয়। প্রতিদিন ১০/১৫ রেলগেট বন্ধ এ শহরের মানুষের নিত্যদিনের বিরম্বনা। তার পরেও সান্তাহারের বেহেস্তখ্যাত রেলগেট বা ভবের বাজার বা ঠক্কর বা বর্তমান স্বাধীনতা চত্তরটি সবার মনের মনি কোঠায় এক কোনায় যায়গা কররে নিয়েছে।
কিছু মানুষের ব্যাক্তিগত প্রচেষ্টায় সান্তাহারের প্রাণকেন্দ্রে স্বাধীনতা মঞ্চ ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতীস্তম্ভেরর কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে।
একটা প্রাচীন অাধুনিক শহরের ইতিহাস লিখতে কমপক্ষে ১০০ পাতা লিখা প্রয়োজন যা আমি পাঁচ পাতাতে লেখার চেষ্টা করেছি। হাসি, কান্না, আনন্দ বেদনার, প্রেম ভালবাসা, বিরহ বিধুরতার এই সান্তাহারের কথা বলতে অকারনে কন্ঠ ভারি হয়, চোখের পাতা ভিজে ওঠে। একটা ইতিহাস লিখছি বড় করে, সেখানে অনেক বড় করে লিখবো আমার সান্তাহারের কথা, যা বাদ পরেছে তা সেখানে বাদ পরবেনা নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
( সুত্রঃ বগুড়া গেজেটিয়ার, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া সান্তাহার, বগুড়ার ইতিকাহিনি – মিছের আলী, ১৯৭১ B B C Radio. নওগাঁর ইতিহাস, নাটোরের ইতিকাহিনি, রানীভবানীর ইতিকাহিনী, বগুড়ার নবাব বাড়ির ইতিহাস, বরেন্দ্রভুমির ইতিহাস, দিনাজপুরের ইতিহাস।
সাহায্য করেছেন সর্বজনাব কছিম উদ্দিন, সাবেক এম পি ও গভর্নর, মোসলেম উদ্দীন সাবেক অধ্যক্ষ সান্তাহার সরঃ কলেজ, গোলাম মোরশেদ সাবেক চেয়ারম্যান সান্তাহার খ ইউ পি ও পৌরসভা, মরহুম মোশাররফ হোসেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান , ডা রানা ও প্রায় শতবর্ষী ৫০ জন সাধারন জনতা ও মুক্তিযোদ্ধা। লিংকগুলো দিলাম না। কারো প্রয়োজন হলে ইনবক্স মেসেজ করবেন।)