দৈনিক সান্তাহার

সান্তাহারে দৃষ্টিকাড়া তালগাছের সারি

santahar barma roadসান্তাহার ডেস্ক:: সান্তাহারের সাইলো সড়কের দুপার্শেরে সারি সারি তালগাছ সবার দৃষ্টি কেড়েছে। তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে। তাল গাছ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এভাবেই লিখেছেন। তাল গ্রাম-বাংলার অতি চিরচেনা ফল। সারি সারি তালগাছে ধরা তাল ও ঝুলন্ত বাবুই পাখির বাসা এবং পাখির কলতান সবার ভালো লাগে। দেশের সকল স্থানে ছোট বড় কমবেশি তালগাছ এখনো চোখে পড়লেও এমন এক অকৃত্রিম দৃশ্য সত্যিই ছোট বড় সব মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। এমন দৃশ্য দেখে ‘ঐ দেখা যায় তালগাছ ঐ আমাদের গাঁ, ঐ খানেতে বাস করে কানা বগীর ছা।’ খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন-এর সেই কবিতার কথা মনে করে অনেকে। সান্তাহার-বগুড়া সড়কের খাড়ির পুল থেকে সাইলো পর্যন্ত সড়কের দুইপার্শে স্থানীয় লোকজন এবং খাদ্য বিভাগের সাইলোতে তৎকালীন কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সারি সারিভাবে এই তালগাছ রোপণ করে। সরকারি জায়গা হওয়ায় এবং সাইলো কর্তৃপক্ষ এই গাছের পরিচর্যা করায় দিন দিন এর সোন্দর্য বাড়ছে। তালগাছ বেড়ে উঠে ধীরগতিতে বীজ রোপণের ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সে এ গাছে ফল ধরে। ফলে এ গাছটির চাষ করতে এখন অনেকের মধ্যে অনীহা দেখা যায়। তবে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে প্রতি বছরই সরকারিভাবে উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কিছু কর্মসূচি পালন করা হলেও নিজ উদ্যোগে এখন আর কেউ তালগাছের চারা রোপণ করতে চায় না। প্রতি বছর বৃক্ষ রোপণ মৌসুমে অন্যান্য বৃক্ষ চারার সহিত যদি সকলে তালগাছের বীজ/চারা রোপণ করা হয় আর নির্বিচারে যদি তালগাছ নিধন না করা হয় তাহলে আমাদের এ দেশে আবারো তালগাছ ফিরে পাবে হারানো ঐতিহ্য। তার সাথে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়া নিশ্চিত হবে ও আগামীর খাদ্যপুষ্টি, অর্থ ও সমৃদ্ধি। দেশীয় ফলের মাঝে তালের অবদান শীর্ষে। অজ্ঞতা ও দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজের চাহিদার কারণে দিন দিন যেভাবে তালগাছ নিধন করা হচ্ছে এতে প্রকৃতি পরিবেশ হারাচ্ছে তার অপরূপ সৌন্দর্য ও তাল গাছের বাবুই পাখির বাসা। আগের মতো এখন আর তেমন চোখে পড়ে না বাবুইর পাখির বাসা। বাবুই, লাল টুকটুকিসহ বেশ কিছু পাখি নিরাপদ ও নিবিড় আশ্রয়ের জন্য একমাত্র তাল গাছকেই বেছে নেয় বসবাসের নিরাপদ স্থান হিসাবে। তালগাছ উচ্চতায় ২০ থেকে ২৫ মিটার হয়ে থাকে এবং দীর্ঘজীবি। ১৪০ থেকে ১৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে। গাছ প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত ফল ধরে থাকে। ফল পাকে ভাদ্র মাসে এবং কোনো কোনো গাছে বছরের অন্যসময়ও ফল ধরতে দেখা যায়। আমাদের দেশের সকল জেলায় কমবেশি তালগাছ দেখা যায় তবে ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে হয় বেশি। প্রায় সব ধরনের মাটিতে তাল গাছ হয়। সহজ রোপণ পদ্ধতি, কষ্ট সহিষ্ণু, কম যত্নে উৎপাদন ও বৃদ্ধির ফলে গ্রামীণ সড়ক, মহাসড়ক, বাঁধ বেড়িবাঁধ, রেললাইন, পুকুর পাড়, খালের পাড়, নদীর পাড়, জমির আইল, পতিত জমি ও বসতবাড়ির শেষ সীমানায় তালগাছ রোপণ উপযোগী স্থান। উল্লেখ্য, গভীর মূলী ও শাখা-প্রশাখা নেই বলে জমির আঁইলে রোপণে খাদ্য পুষ্টির প্রতিযোগিতা ও ছায়া দিয়ে ফসলের ক্ষতি করে না। তালের পাতা দিয়ে হাতপাখা, মাদুর, টুপি, ঘরের ছাউনি, চাটাই, ছাতা, লাকড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গাছের ফাইবার বা আঁশ থেকে বিভিন্ন রকমের সৌখিন সামগ্রী তৈরি হয়, যথা- টুপি, ঝুড়ি, ব্রাশ পাপোষ, ছোট বাস্কেট ও মাছ ধরার খলশানীতে ব্যবহৃত হয়। পুরুষ গাছের ফুল বা জটা হতে রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে গুড়, পাটালি, ভিনেগার, পিঠা, বড়া, লুচি ইত্যাদি তৈরি করা হয়। পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা, বড়া, খির, পায়েস তৈরি করা হয়। কচি ও কাঁচা তালের নরম শাঁস মুখরোচক পুষ্টিকর ও ছোট বড় সবার প্রিয়। এছাড়া গ্রীষ্মের তৃষ্ণা নিবারণে কাজ করে। তাল গাছের গোড়ার অংশ দিয়ে ডিঙ্গি নৌকা তৈরি, শক্ত ও মজবুত বলে ঘরের খুঁটি, আড়া, রুয়া, বাটাম, কৃষকের লাঙ্গলের ঈষ তৈরি করা হয়। গাছ শক্ত মজবুত গভীর মূলী বলে ঝড় তুফান, টর্নেডোর বাতাস প্রতিরোধ ও মাটি ক্ষয়রোধে তাল গাছের ভ‚মিকা অতুলনীয়। তাল ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার, তালের রস শ্লেমানাশক, সূত্রবর্ধক, প্রদাহ ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিবারণ করে। রস থেকে তৈরি তাল মিসরি সর্দি কাশিতে মহৌষুধ হিসেবে কাজ করে। যকৃতের দোষ নিবারক ও পিত্তনাশক হিসেবেও কাজ করে থাকে।
তথ্যসূত্র:: সাংবাদিক মনসুর আলী, দৈনিক ইনকিলাব

>> সান্তাহার ডটকম/ইএন/৭ এপ্রিল ২০১৭ইং